
চলছে বর্ষা মৌসুম আর পরীক্ষার প্যারা। এই পরীক্ষা-ময় জীবনের মধ্যে একটা ট্যুর দিলে খারাপ হয় না। ভাবতে ভাবতে ফেসবুকে ঢুকলাম, নিউজফিড দেখে আরো হতাশা হলাম। এই মুহূর্তে আমার নিউজফিডই যেন এই পেয়ারা বাগানের পর্যটন কেন্দ্র!
ফ্রেন্ড লিস্টে সবার এমন পেয়ারা বাগানের ছবি দেখে ঠিক করলাম মিশন পেয়ারা বাগান। খবর পটুয়াখালী পরিবার একসাথে ঘুরতে গেলে বিষয়টি আরো সুন্দর হতো। বিষয়টি শেয়ার করলাম খবর পটুয়াখালীর হেড অফ নিউজ মো: রায়হান ভাইয়ের সাথে। তবে সেও আরো হতাশা করলো। পুরো টিম এই মুহূর্তে একসাথে যাওয়া সম্ভব না সবাই ব্যস্ত, আবার সম্পাদক আরিফ ভাইয়া ঢাকা যাবে অফিসিয়াল কাজে। এছাড়া অনেকেই পেয়ারা বাগান ভ্রমণ করছে, তুমি পটুয়াখালীর অন্য যে কোন একটা টিমের সাথে যাও সেটাই ভালো হবে!
এ কথা শোনার পর হুট করেই মাথায় এলো আমার নিজেরই তো টিম রয়েছে! আমাদের সংগঠন ধূমকেতু ইয়ুথ ফাউন্ডেশন অনেক দিন কোন আনন্দ ভ্রমণে যায়নি। ডিওয়াইএফ টিমের সাথে কথা বলে পেয়ারা বাগান ভ্রমণের তারা উঠিয়ে দিলাম। অবশেষে ৭ তারিখ ঠিক হলো, ভ্রমণের নাম দেয়া হলো “ধুমকেতুর সীমাহীনতা” ।
৬ আগস্ট আগের রাতে সব প্ল্যান করে তারাতাড়ি ঘুমিয়ে পড়লাম। এলার্ম দিয়ে রাখা বেশ শান্তির একটা ঘুমই দেয়া হলো। তবে ঘুম ভাঙতেই বাজলো বিপত্তি বাইরে প্রচণ্ড বৃষ্টি! এদিকে গাড়ি সহ সকল কিছু ঠিক করা।
এবার আর হতাশাকে কাছে আসতে দেইনি যাবো প্রকৃতির কাছাকাছি, বৃষ্টি তো তাতে আরো নতুন মাত্রা যোগ করবে। এই কথা বলেই রেইনকোট পরে বেরিয়ে পড়লাম। আগের রাতে ব্যাগ গুছিয়েই রেখেছি। লাস্ট কবে এত সকালে ঘুম থেকে ওঠা হয়েছে তা মনে নেই বৃষ্টির মধ্যে হাঁটছি আর মন খুলে প্রকৃতি উপভোগ করছি। এমন সকাল আগে কখনো উপভোগ করার সুযোগ হয়নি।
আমাদের এবার ভ্রমণের যাত্রা শুরু হলো। সবার সকালের নাস্তার পর ভোর সাড়ে ৬টায় লতিফ স্কুল রোডে ডিওয়াইএফ এর অফিসের সামনে থেকে শুরু হয় যাত্রা। চলতে চলতে আমরা বেশ আনন্দ করছি যেখানে সবার চোখে থাকার কথা ঘুম, সেখানে আনন্দের হুড়োহুড়ি। আমাদের উদ্দেশ্য সরকারি ভাসমান বাজার ভিমরুলি, কারণ রায়হান ভাই পরামর্শ দিয়েছেন আটঘর কুরিয়ানা থেকে ট্রলার নেয়ার খরচ বেশি এবং সেখানে তেমন কিছুই নেই দেখার।

ভাসমান বাজার দেখার লোভে আমরা কোন যাত্রা বিরতি না দিয়ে বরিশাল রুপাতলী হয়ে চলতে থাকি ভিমরুলি। কয়েক ঘণ্টায় পৌঁছে যাই ভাসমান বাজারে এখনও বাজার পুরোপুরি শুরু হয়নি, সবে শুরু হয়েছে।
ঝালকাঠি, বরিশাল আর পিরোজপুরের সীমান্তবর্তী এলাকার ২৬ গ্রামের প্রায় ৩১ হাজার একর জমির উপর গড়ে উঠেছে পেয়ারা বাগান। আর এ পেয়ারা চাষের সঙ্গে প্রায় ২০ হাজার পরিবার সরাসরি জড়িত। তাদের এই পেয়ারা বিক্রির জন্যই বিখ্যাত ভিমরুলি ভাসমান পেয়ারা বাজার।

এই ভাসমান বাজার ঝালকাঠি জেলা শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে ভিমরুলি গ্রামের আঁকাবাঁকা ছোট্ট খালজুড়ে সপ্তাহের প্রতিদিনই সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে বিকিকিনি। হাটটি সারা বছর বসলেও প্রাণ ফিরে পায় পেয়ারা মৌসুমে।
খালের মধ্যে ছোট ছোট ডিঙি নৌকায় ঢেউয়ের তালে তালে আসছে পেয়ারা কোনটিতে পেয়ারা দিয়ে নৌকা ঢাকা, আবার কোনটিতে প্লাস্টিকের ঝুড়ি ও বাঁশের ঝুড়ি ভর্তি পেয়ারা। চার মোহনায় বসেছে বাজার। বেচাকেনার দৃশ্য দেখে মুগ্ধ না হয়ে উপায় নেই।

দামের অভিজ্ঞতা নিতে এবং সবার বাসার জন্য পেয়ারা নিতে শুরু করলাম দামাদামি নৌকা বোঝাই পেয়ারা চাইছে ৪-৬ হাজার টাকা, প্লাস্টিকের বড় ঝুড়ি যাচ্ছে ৪৫০-৮০০ টাকা, বাঁশের ছোট ঝুড়ি যাচ্ছে ১০০-১৬০ টাকা। তবে সাথে ঝুড়ি বা নৌকা কোনটিই পাচ্ছেন না, নিতে হলে আপনার ব্যাগ বা বস্তার ব্যবস্থা করতে হবে। আমার কাছে ভালো লেগেছে যে এখনকার বিক্রেতারা পলিথিন ব্যবহার করছে না।
বাজারের অভিজ্ঞতা নিয়ে এবার পালা পেয়ারা বাগান দেখার। ভাগ হয়ে গেল টিম যারা সকালে খাবার খায়নি তারা ভাসমান হোটেলে খাবার খেতে গেল, সঙ্গে একদল দুপুরের খাবারের জায়গা খুঁজতে ও অর্ডার দিতে।
বাকি এক টিম বাগান ভ্রমণের জন্য নৌকা খুঁজতে লাগলো। আমরা কি নৌকায় ঘুরবো, না ট্রলারে তা ঠিক করতে করতে বাকি টিম চলে এলো। নৌকা চাইছে ঘণ্টায় ৩০০ টাকা, ট্রলার যাচ্ছে ঘণ্টায় ৬০০ টাকা। লোকসংখ্যা বেশি থাকায় সিদ্ধান্ত হলো ট্রলারে যাবো। তবে ট্রলার ঠিক করতে বেশ ঝামেলা পোহাতে হলো সিরিয়াল ছাড়া কোন ট্রলার যাবে না এবং ভাড়াও কমবে না। কিছুক্ষণ ঘাটের অবস্থা বোঝার চেষ্টা করলাম এবং সিন্ডিকেট ব্যাপারটা পুরোপুরি মাথায় চলে এলো।
ট্রলারে কম হলেও ৫০ জনের ধারণক্ষমতা রয়েছে। তবে ঘাটের লোকেরা এক গ্রুপের বেশি যেতে দেবে না তাতে ২ জন হলেও একটি ট্রলার নিতে হবে, ৩০ জন হলেও একটি ট্রলার। ঘাট থেকে কিছুটা উপরে উঠে অন্য ঘুরতে আসা একটি গ্রুপ খুঁজতে লাগলাম এবং পেয়ে গেলাম ৪ জনের একটি গ্রুপ। অবশেষে ২ ঘণ্টার জন্য ১১০০ টাকায় ভাড়া হলো ট্রলার যেখানে ৪ জনের গ্রুপ ৪০০ টাকা দেবে, বাকি ৭০০ টাকা আমরা দিবো।

শুরু হলো নতুন ভ্রমণ, যার মধ্যে বৃষ্টি যুক্ত করেছে ভ্রমণের নতুন মাত্রা। ভিমরুলির আশপাশের সব গ্রামেই অসংখ্য পেয়ারা বাগান দৃষ্টিপথে ধরা দেবে সবুজের সমারোহ। এসব সবুজের বেশিরভাগ হোগলা, সুপারি, আমড়া আর পেয়ারার বন। ১০ মিনিটের মতো ট্রলার চলতে চলতে নিয়ে গেল এক পেয়ারা বাগান পার্কে। ৩০ টাকা প্রবেশ মূল্য দিয়ে শুরু হলো বাগান পরিদর্শন। যদিও বাগানে পেয়ারা উন্মুক্ত যে যা খেতে পারে, তবে বাগানে খাবার মতো পেয়ারা আমার কপালে মিলেনি।

বাগানের দৃশ্যের টপ ভিউ দেখতে রয়েছে কাঠের তৈরি উঁচু পথ যদিও কিছুটা ভয়ংকর। অতিরিক্ত মানুষ উঠলে এটি ঝুলন্ত ব্রিজের মতো দুলতে থাকে। যাদের অ্যাক্রোফোবিয়া রয়েছে তাদের এই অভিজ্ঞতা না নেয়াই ভালো।

যতটা বড় বাগান ভেবেছিলাম তেমন বড় নয় কিছুটা সময় পেয়ারা খুঁজে আবার নৌকায় বাজারে ফিরে এলাম। বছরের মধ্য জুলাই থেকে মধ্য সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পেয়ারার মৌসুমে থাকলেও জুলাই সেরা সময় এই ভ্রমণের জন্য। এখানে পেয়ারাবাগান ও ভাসমান হাটকে ঘিরে গড়ে উঠেছে পর্যটন ব্যবসা। কয়েক বছর আগে পর্যটকদের আকর্ষণ বাড়াতে ব্যক্তিগত উদ্যোগে পেয়ারাবাগানে গড়ে উঠেছে কয়েকটি পার্ক ও পিকনিক স্পট। পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর থেকে পর্যটকের সংখ্যা বেড়েছে। বিভিন্ন সময়ে পেয়ারাবাগান ঘুরে গেছেন ভারত, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতরা।
ঘড়িতে এখন দুপুর ১টা আগেই খাবার অর্ডার করে যাওয়া হোটেলে ফিরলাম। ভাসমান পেয়ারার বাজারের সব হোটেলের নামই “ভাসমান হোটেল”, তবে এটি পুরোপুরি ভাসমান নয় অর্ধেক মাটিতে, অর্ধেক কাঠ দিয়ে খালের উপর নির্মিত।
খাবার শেষ করে আশপাশের মানুষের জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতি নিয়ে ধারণা নিচ্ছিলাম। জনশ্রুতি রয়েছে, ভারতের বিহার রাজ্যের গয়া থেকে কেউ একজন একটি সুস্বাদু পেয়ারা এনেছিলেন। সেই পেয়ারার বীজ বপন করেই এ অঞ্চলে পেয়ারা চাষের গোড়াপত্তন ঘটে। গয়া থেকে আনা হয়েছিল বলে স্থানীয় লোকদের কাছে পেয়ারা ‘গৈয়া’ নামে পরিচিত।
রায়হান ভাই বলে দিয়েছিলেন, ভাসমান বাজারের আগে জমিদার বাড়ি রয়েছে, বেশ সুন্দর স্থাপনা। সূর্য থাকতে থাকতে উঠে পড়লাম গাড়িতে, শুরু হলো জমিদার বাড়ির ঠিকানা খোঁজা। ঝালকাঠি সদর উপজেলার কীর্ত্তিপাশা গ্রামে অবস্থিত তথা ভাসমান বাজার থেকে ৪ কিলোমিটার দূরে মিললো কমলিকান্দর নবীন চন্দ্র বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়—যেটি কীর্ত্তিপাশা জমিদার বাড়ি ছিল।

বাড়িটিতে ঢুকেই অন্যরকম অনুভূতি। ইন্টারনেট থেকে জানা গেল—১৮শ শতকের ঐতিহাসিক স্থাপনা, যা বিক্রমপুরের রাজা রাম সেনগুপ্ত নির্মাণ করেন তাঁর দুই ছেলের জন্য। পরবর্তীতে ‘বড় হিস্যা’ ও ‘ছোট হিস্যা’ নামে পরিচিত হয়, যার মধ্যে ছোট হিস্যা বিলুপ্ত, বড় হিস্যার কিছু অংশ এখনও টিকে আছে এবং সেখানে দুটি বিদ্যালয় চালু রয়েছে। জমিদার পরিবারের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক করুণ কাহিনি জমিদারপুত্র বিষপানে মৃত্যুবরণ করলে তাঁর স্ত্রী সতী প্রমাণে আগুনে আত্মাহুতি দেন। একসময় এখানে নাটমন্দির, মন্দির, হলঘর ও শান বাঁধানো পুকুর ছিল, যা অবহেলায় আজ অনেকটাই ধ্বংসপ্রাপ্ত।

বৃষ্টিভেজা প্রকৃতি, পেয়ারা ভরা খাল, ভিমরুলির হাসিখুশি মানুষ আর জমিদার বাড়ির নীরব স্মৃতি সব মিলিয়ে একদিনে যেন অনেক জীবনের গল্প ছুঁয়ে গেলাম।
পথে ফিরতে ফিরতে মনে হচ্ছিল, জীবনের আসল আনন্দ লুকিয়ে আছে এমনই ছোট ছোট অভিযানে যেখানে আমরা নতুন কিছু দেখি, শুনি, শিখি আর অনুভব করি।



